মাল্টার মর্গে পড়ে আছে বাংলাদেশির মরদেহ, দেশে নিতে চায় না পরিবার

জাতীয়

ইসমাইল হোসেন স্বপন, ইতালী প্রতিনিধি: এ যেন নির্মম এক বাস্তবতা। জীবনের গল্পটা যাদেরকে ঘিরে, সেই তারাই যেন আজ অতি অচেনা। পরিবারের হাল ফেরাতে যাদের জন্য পাহাড়-জঙ্গল আর সাগর-নদী পাড়ি দেওয়া, সেই স্বজনেরাই ভুলে গেল এক দুর্ঘটনায়। ছিন্ন করল সব বন্ধন।

বলছি ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো এক বাংলাদেশি যুবকের কথা। যার নাম ইমরান খান ওরফে সুজন। তিনি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার মুলফৎগঞ্জ ইউনিয়নের কেদারপুর গ্রামের মান্নান খানের ছেলে।

ইউরো মুদ্রায় নেশায় ইমরান খানসহ নাম না জানা আরও অনেকে একত্রে গেল বছর কতিপয় কিছু অসাধু দালালদের প্রলোভনে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে প্রথমে লিবিয়া প্রবেশ করে।

মানব পাচার একটি চক্রের শিকার হয়ে তাদেরকে অনেক টাকার বিনিময়ে ইউরোপে আসার প্রাথমিক উদ্দেশ্য গ্রহণ করে। পরবর্তী অনেক সময় অতিবাহিত হয়। বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে গোপন অবস্থানে থাকতে হয়। কিছু সময় পাহাড়ের গুহায় অথবা মরুভূমির কোন এক বালুর ঘরেও থাকতে হয়।

সবকিছুর ইতি ঘটিয়ে ১৬ই আগস্ট ৮৪ জন অবৈধ দেশি ও বিদেশি সঙ্গী নিয়ে ইমরান খানও পাড়ি জমায় ভূমধ্যসাগরের বুকে। সেই উত্তাল ও ভয়ংকর সাগরের বুকে ৮৪ জন লোক ছোট একটি প্লাস্টিকের নৌকায় ৩/৪ দিন ভাসতে থাকে। এমনই একটি ছোট নৌকায় একজনের উপর ৪/৫ জন বসতে বাধ্য হয়।

এছাড়াও ছিল না প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি। যেন মিলছে না কোন শেষ ঠিকানা, মিলছে না কোন বাঁচার ঠাই, তাই এ জীবন যুদ্ধ যেন এখানেই শেষ। ইমরানের খানের স্বাভাবিক অবস্থা পানির পিপাসায় এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।

২১শে আগস্ট তার বন্ধুদের কোলে ঠিকানাহীন সেই সাগরের বুকে জীবন যুদ্ধে হেরে যায়, একটি অসমাপ্ত ফুটন্ত জীবন। পরিশেষে, দিনের শেষে ভাসতে ভাসতে অজানা সাগরের ঠিকানায় ইউরোপের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টার কোস্ট গার্ডের কাছে ঠাঁই মেলে।

পরে সবাইকে ইউরোপিয়ান আইনের মাধ্যমে জীবিতদের আশ্রম কেন্দ্রে রাখা হয় এবং সেই মৃত্যু ইমরানকে মাল্টার সরকারি মর্গে (কাস্টডি) রাখা হয়। কিছুদিন পরে বিষয়টি মাল্টায় বসবাসরত কিছু বাংলাদেশী নাগরিকের নজরে আসে।

পরে প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা মশিয়ার রহমানের নেতৃত্বে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তার আপন বোনের সাথে (বর্তমান ইতালি অবস্থানরত) এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত তার ভাই শোভন খাঁনের সাথেও অনেকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু টাকা খরচের কারণে মৃত্যু ইমরান খানের লাশ গ্রহণ করতে চায়নি কেউ।

এরপর বিষয়টি সময়ের ব্যবধানে থেমে থাকে। সম্প্রতি মাল্টায় নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংগঠন হওয়ার পর সংগঠনের সভাপতি মশিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আপেল আমিন কাওসারসহ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে পুনরায় ইমরান খানের বিষয়টি আলোচনায় আনেন।

বিষয়টি নিয়ে চলতি মাসের ২ ও ৩ তারিখ মাল্টার স্থানীয় সরকারি প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় এবং মাল্টার প্রশাসনিক বিভাগের সাথেও আলোচনা করে আওয়ামী লীগ নেতারা।

আলোচনা শেষে মাল্টা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ-সভাপতিসহ মাল্টার প্রশাসন সাথে নিয়ে উক্ত লাশটি শনাক্ত করতে যায়।

পরে নেতারা জানান, লাশটি দেশে পাঠাতে ৬/৭ লক্ষ টাকার মতো খরচ হবে। তবে যেকোনো মূল্যে ইমরান খানকে তারা দেশে পাঠাবেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, মাল্টায় অবস্থানরত সকল বাংলাদেশিদের সহযোগিতায় আমাদের নিজ খরচে এই লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

জানা গেছে, সকল প্রক্রিয়া শেষ করে এই মাসেই ইমরান খানের লাশটি বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হবে।

মাল্টা আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, আমরা এখানে অনেক বেশি ভোগান্তিতে ভুগছি, কারণ আমাদের কোনো বাংলাদেশি প্রতিনিধি নেই, নেই কোন দূতাবাসের সহযোগিতা। আমাদের এখানে অতি দ্রুত দূতাবাস সেবার ব্যবস্থা করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করছি।

নেতারা আরও বলেন, আজকে আমাদের যদি মাল্টায় দূতাবাস থাকতো তাহলে হয়তো বা ইমরান খানের লাশটার এতো কষ্ট হতো না। এটা অনেক সহজ হতো আমাদের কাজটা করতে। এইরকম অনেক ঘটনাই আছে, যা দূতাবাস না থাকায় আমরা অনেক কষ্ট করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *